হলিক্রস স্কুল & কলেজে হিজাব নিষিদ্ধকরণ প্রশ্নে সেই প্রতিষ্ঠানের একজন ছাত্রী একটা দারুণ প্রপোজিশন আমাদের সামনে এনেছেন৷ তার মত হচ্ছে, শিক্ষকদের সামনে কেন হিজাব পরতে হবে? তাদের সামনে পর্দা কেন? শিক্ষকদের তো কোন লিঙ্গ নেই৷ থাকতে পারে না। তারা হলেন মহান শিক্ষক৷
এই ছাত্রী বোনটির সরলতা মুগ্ধকর। ইন্টারের মেয়েদের মধ্যে এই সরলতা-টা আছে, থাকে। আমি এইটাকে বলি, একটা নিষ্পাপ চঞ্চলতা, সরল চপলতা - ইন্টারের মেয়েদের ট্রেডমার্ক। এই জিনিসটা আমাকে মুগ্ধ করে৷
![]() |
| © কলা বিজ্ঞানী |
পাশাপাশি কিছু চিন্তারও উদ্রেক করে অবশ্য৷ এই যে, শিক্ষকের কোন লিঙ্গ নেই - এই ভাবনা, এর এপিস্টেমোলজি এবং অন্টোলজি নিয়ে যদি আমরা ভাবি, আমরা দুইটা ব্যাপার দেখতে পাই।
প্রথমত, শিক্ষকের কোন লিঙ্গ নেই ভাবনাটি seeing is believing ধারণাকে জাস্টিফাই করে৷ হ্যাঁ, শিক্ষকের লিঙ্গ আছে কি নেই, সেটি আমরা তখনই নিশ্চিত হতে পারবো, যখন আমরা একজন শিক্ষকের লিঙ্গটি দেখবো। unless & untill আমরা একজন শিক্ষকের লিঙ্গ তার ছাত্র বা ছাত্রী হিসেবে দেখতে পারছি, তার আগ পর্যন্ত আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি না যে, শিক্ষকের লিঙ্গ আছে বা নেই৷
এবং এইটা মোটামুটিভাবে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত যে, একসেপ্টেবল স্যাম্পলিং সাইজ হচ্ছে মোট ভলিউমের প্রায় ১০%। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনে ১০ জন শিক্ষককে তার ছাত্র বা ছাত্রীদের দ্বারা চেক করাতে হবে যে, শিক্ষকের লিঙ্গ আছে কি নেই৷ তারপর ডাটা এনালাইসিস করে আমাদেরকে এই সিদ্ধান্তে আসতে হবে৷ তার আগ পর্যন্ত কেউ যদি seeing is believing এর মধ্যে থাকতে চায়, এবং দাবী করে যে, যেহেতু আমি এখনো দেখি নাই, তাই শিক্ষকের কোন লিঙ্গ নাই; তার এই দাবীকে আমরা একেবারে উড়িয়ে দিতে পারি নাই৷
এবং আরো ইন্টারেস্টিংলি, শিক্ষকের লিঙ্গ থাকা না থাকার ব্যাপারটা একটা কোয়ান্টাম ফিজিক্সের গবেষণার বিষয়ও হতে পারে৷ শ্রোডিঞ্জার'স ক্যাটের মতো একইসাথে শিক্ষকের লিঙ্গ আছে এবং নাই - এর মতো ব্যাপারও হতে পারে৷ এটাও আমাদেরকে বিবেচনায় রাখতে হবে৷
দ্বিতীয়ত, আমাদের সাইকোলজিতে যে কোন কারো উপরে মহত্ত্ব আরোপ করার সাথেসাথেই তার লিঙ্গ নাই করে দেওয়ার যেই মনস্তত্ত্ব, তাকে বুঝাও জরুরি৷ আমরা ইতিপূর্বে শুনেছি লালনের কোন জাত-পাত যেমন নাই, তেমন নাকি তার লিঙ্গও নাই৷
আমরা বিভিন্ন অধিকার ভিত্তিক আলাপেও শুনি যে, নারীকে মানুষ ভাবতে হবে, পুরুষকে আগে মানুষ হতে হবে - ইত্যাদি আলাপগুলোতে মানুষ বলতে যখন অন্যান্য সকল প্রাণীর চেয়ে মহৎ একটা সৃষ্টিকে কল্পনা করা হয়, সেই কল্পনায় নারী বা পুরুষকে তার নারীত্ব বা পুরুষত্বের লৈঙ্গিক পরিচয়কে ফেলে দিয়ে আগে মানুষ হতে বলা হয়৷ যেন শুধুমাত্র এই লিঙ্গটার জন্যই নারী এবং পুরুষ ঠিকঠাকভাবে এই মহৎ ও মহান সৃষ্টি 'মানুষ'টা হয়ে উঠতে পারতেছে না৷
এই যে লিঙ্গের প্রতি আমাদের এতো রাগ, তাকে মহান হবার পথে প্রধান বাধা ও অন্তরায় ভাবা এবং 'মানুষ' হয়ে উঠার জার্নিকে মূলত লিঙ্গকে অতিক্রম করার জার্নি হিসেবে দেখার আমাদের যে অভিপ্রায়, তার এপিস্টেমোলজিতে কি কোন সেক্সুয়াল ফ্রাস্টেশন আছে? কোন সেক্সুয়াল টর্চার ও ডিপ্রাইভেশন আছে? পলিটিক্স অফ সেক্স এন্ড পলিটিক্যাল ইকোনমিকস অফ সেক্স আছে? আমাদেরকে এই প্রশ্নের উত্তরগুলো খুঁজতে হবে।
এবং তারচেয়েও বড় কথা হচ্ছে, এই যে একটা সাধারণ ইন্টারের মেয়ে, তার একেবারেই সরল এবং সাধারণ যে একটা স্টেটমেন্ট - শিক্ষকের কোন লিঙ্গ নেই; এই স্টেটমেন্টের মধ্যে যে বিশাল জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রশ্ন, হিউম্যান সাইকোলজি, মেটাফিজিক্স, আমাদের গোটা সোশ্যাল সায়েন্সের এপিস্টেমোলজি এবং অন্টোলজি লুকিয়ে আছে, আমরা কি আদৌ ভাবি? নাকি শুধুমাত্র সে ইন্টারের মেয়ে বলেই তার এই নিষ্পাপ চঞ্চলতা আর সরল চপলতাকে আমরা, আমাদের এই বয়সের ভারে ন্যুব্জ সমাজ কিশোরী মেয়ের বেয়াড়াপনা হিসেবে দেখে এড়িয়ে যাই?
এই প্রশ্ন রেখে গেলাম আমাদের তাবৎ বুদ্ধিজীবী সমাজ এবং চিন্তাশীল মানুষদের কাছে৷
লেখক: আরেফিন মোহাম্মদ (পুরোনো প্রাসঙ্গিক পোস্ট)
