জেরুজালেম থেকে ঠিক ১১ কিলোমিটার উত্তরে যে শহরটি শত সংগ্রামের করুণ ইতিহাস নিয়ে বুক টানটান করে দাঁড়িয়ে আছে, তার নাম রাফাত। শান্ত, স্নিগ্ধ অথচ ব্যথা-বেদনায় গভীরভাবে ভারাক্রান্ত এক শহর। ১৯৬৬ সালের ২২ মার্চ ঝকঝকে দিনটিতে যে শিশুটি এই শহরেরই এক দরিদ্র পিতা-মাতার ঘরে জন্মগ্রহণ করল, তাঁর নাম আয়াশ। বাবা একজন সামান্য মুদি দোকানদার মাত্র। সময়ের নানাবিধ পথ-পরিক্রমায় কত বিচিত্র ঘটনাপ্রবাহের ভেতর দিয়ে বেড়ে উঠতে লাগল আয়াশ!
![]() |
| ছবি: উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহীত |
উচ্চশিক্ষার বড়ো স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হলো রামাল্লার বিরজেইত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। চোখেমুখে লেপ্টে থাকে স্বপ্ন—একদিন বড়ো ইঞ্জিনিয়ার হয়ে পরিবারের হাল ধরবে। কিন্তু বিধি বাম! ইজরাইলি সরকার হঠাৎ বন্ধ করে দিলো বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক কার্যক্রম। অন্ধকার নেমে এলো আয়াশের জীবনজুড়ে। তবে কি তাঁর ইঞ্জিনিয়ার হবার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে? সে সীমানা পাড়ি দিয়ে জর্ডানে গিয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে চাইল। কিন্তু মিলল না ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষের অনুমতি।
আয়াশ এবার বুঝে ফেলল তাঁর জীবনের নিগুঢ়তম সত্যটি। তারা নিজভূমে পরবাসী হয়ে আছে। যে দেশটি ছিল একান্তই তাদের, যে দেশের আলো-বাতাস, ফসলের মাঠ ছিল একান্তই তাদের মালিকানা; শকুনের দল তা নিজেদের করে নিতে চাইছে। মেসোপোটেমিয়া থেকে ফিলিস্তিনে এসে বসত গড়া, এরপর রোমানদের তাড়া খেয়ে বাইরের বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া বহিরাগতদের এই দলটি দুই হাজার বছর পর এসে দাবী করছে—তারাই ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের আসল মালিক! এটি তাদের জন্য স্রষ্টার দেওয়া প্রমিজল্যান্ড! আর তাদেরকে নির্লজ্জ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমাগোষ্ঠী। অথচ যে রাষ্ট্রধারণার ভিত্তিতে তারা ইজরাইলকে সমর্থন দিচ্ছে, তাতে তাদের নিজেদের অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।
আয়াশ এবার জীবনের একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিলো। জড়িয়ে গেল ক্বাসসাম ব্রিগেডের সঙ্গে; হামাসের একটি সশস্ত্র ব্রাঞ্চ। হৃদয়ে তাঁর দেশকে স্বাধীন করার মহান ব্রত। ছদ্মবেশ ধারণে ছিল তাঁর বিশেষ দক্ষতা। একেকদিন একেক পোশাক আর বেশভূষায় তাকে দেখা যেতে লাগল। কোনো বাড়িতেই এক রাতের বেশি ঘুমাত নাই সে।
দিনে দিনে হয়ে উঠল ইজরাইলিদের মাথাব্যথার কারণ। বানাতে পারত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বোমা। সেই বোমার কতটা নিখুঁত বিস্ফোরণ সম্ভব, তা-ও বলে দিত সহযোদ্ধাদের। দলের মধ্যে তাঁর উপাধি হয়ে উঠল 'দ্য ইঞ্জিনিয়ার।' একবার ইজরাইলি প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিন তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেছিল, 'I am afraid, he might be sitting between us here in the Knesset.'
১৯৯৪ সালের ১৯ অক্টোবর। তেলআবিব স্কয়ারের কাছাকাছি এক আত্মঘাতী বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। নিহত হয় ২২ ইজরাইলি, আহত হয় ৪৮ জন। নড়ে ওঠে অবৈধ ইজরাইলিদের অস্তিত্বের ভিত। এই হামলার নেপথ্য নায়ক ছিল বীর সেনানী ইয়াহিয়া আয়াশ। এরপর ইজরাইলি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনেকটা মাথা খারাপের জোগাড় হয়।
যেকোনো মূল্যে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় আয়াশকে। কোমর বেঁধে অভিযানে নেমে পড়ে ইজরাইলি গুপ্তচররা। গ্রেফতার করা হয় তাঁর বাবা-মা আর দুই ভাইকে। অকথ্য নির্যাতন চালানো হয় তাদের ওপর। নির্যাতনে বধির হয়ে যান আয়াশের বাবা। গ্রামের বৈদ্যুতিক লাইন কেটে দেওয়া হয়। কিন্তু কিছুতেই তাঁর নাগাল পায় না ইজরাইলি গুপ্তচররা।
১৯৯৬ সালের জানুয়ারি মাস। দিনটি ছিল শুক্রবার। সময় সকাল ৮টা। ইজরাইলিদের কাজকে সহজ করতে এগিয়ে এল বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার স্বাধীনতা হরণের কুশিলব বিশ্বাসঘাতক মীর জাফরের প্রেতাত্মা কামাল হামাদ। সে ছিল ফিলিস্তিনি। অথচ এক স্বজাতি বীরকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে তাঁর বুক কাঁপেনি একটুও। কামাল হামাদের ভাতিজা ওসামা হামাদ ছিল আয়াশের বন্ধু। তারা দুইজন একই বাসায় আত্মগোপনে ছিল।
তাদের সঙ্গে দেখা করতে এলো কামাল। হাতে একটি মোটোরোলা আলফা মোবাইল ফোন। সেই ফোনে আয়াশের বাবার একটি ফোন এলো। কথা বলার জন্য ফোনটা হাতে নিয়ে ঘরের ভেতরে চলে গেল আয়াশ। ফোনে সেট করা ছিল ৫০ মিলিগ্রাম ওজনের বোমা। মুহূর্তেই বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল একজন বীর সেনানীর পবিত্র শরীর।
এমন হাজারো শহীদের পবিত্র রক্তে রক্তিম হয়ে আছে ফিলিস্তিন, আমাদের ভালোবাসার জনপদ। সময় আসছে। একদিন ফিলিস্তিন ফিরে পাবে তার স্বাধীন ভূখন্ড। সেদিন আরও অনেক শহীদের সঙ্গে উচ্চারণ করা হবে একটি নাম—শহীদ ইয়াহিয়া আয়াশ।
তথ্যসূত্র :
1. Inside Hamas : The Untold Story of the Militant Islamic Movement- Zaki Chehab.
2. Rise and Kill First : The Secret History of Israel's Targeted Assassinations- Ronen Bergman.
3. দ্য কিংডম অব আউটসাইডারস—সোহেল রানা।
লিখেছেন: লাবিব আহসান
