ট্রান্সজেন্ডারিজম তথা লিঙ্গ রূপান্তর'বাদ প্রসঙ্গে সৌদি আরবের ইলমি গবেষণা ও ফতোয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটি (আল-লাজনাতুদ দায়িমা লিল বুহুসিল ইলমিয়্যাতি ওয়াল ইফতা) প্রদত্ত ফতোয়া নিম্নে উল্লেখ করা। এখানে ট্রা| ন্স| জে| ন্ডা| রিজম প্রসঙ্গে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কিছু ইসলামী পণ্ডিতের অভিমত উঠে এসেছে। এই রকম ইসলামবিরোধী বিষয় কিছুতেই যেন আমাদের দেশের আইনে এবং পাঠ্যপুস্তকে না আসে, সেই ব্যাপারে সকলকে সচেষ্ট থাকতে হবে।
সবাই বেশি করে গুরুত্বপূর্ণ এই ফতোয়াটি বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করি।
![]() |
| © কলা বিজ্ঞানী |
প্রশ্ন : ❝ইসলামে আমার জন্য কি এমন লি| ঙ্গ-পরিবর্তনের অপারেশন করার বৈধতা আছে, যার মাধ্যমে আমি পুরুষ থেকে নারীতে রূপান্তরিত হব? আমি ছেলে হয়ে জন্মগ্রহণ করেছি, এমনকি ফিজিয়োলজিক্যাল (শারীরবৃত্তীয়) দিক থেকে আমি এখনও একজন পুরুষ। আমি পশ্চিমা সমাজে প্রতিপালিত হয়েছি, যারা এমন কিছু আদর্শকে উপভোগ করে, যেগুলো আমি পুরোপুরি অপছন্দ করি এবং ঘৃণা করি। বছর চারেক আগে আমার প্রাত্যাহিক নামাজে আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা আরম্ভ করেছি। এখন পর্যন্ত আমি কেবল এই পর্যায়ে পৌঁছতে পেরেছি যে, এই বিষয় সম্পর্কে আপনাদের মতো আলিমকে আমি প্রশ্ন করতে পারছি। আশা করি, আল্লাহ আপনাদের ইলম ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে এই প্রশ্নের উত্তর জানার তৌফিক দেবেন আমাকে।
.
আমার এই প্রশ্ন পশ্চিমা চেতনা থেকে উদ্ভূত হয়েছে; আমার শৈশব থেকে নিয়ে আমি যেই ধ্যানধারণার মাঝেই বড়ো হয়েছি। আমি (জন্মগত) পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও একজন পুরুষের ভূমিকা পালন করতে অপছন্দ করি; নিজেকে আমার ‘নারী’ বলে মনে হয়। বর্তমানে আমার অনুভূতি আরও জটিল হয়ে গেছে। যদিও আমি দৈহিকভাবে একজন পুরুষ এবং পরিপূর্ণরূপে একজন পুরুষের ভূমিকা পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব, তথাপি সাইকোলজিক্যালি (মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে) আমার মাঝে নারীত্বের বৈশিষ্ট্যসমূহ রয়েছে। আবেগ ও যৌনাবেদনের দিক থেকে মনের মধ্যে আমি পুরুষ ছেলেদের প্রতি আকর্ষণ ও টান অনুভব করি। অবশ্য আমি কোনো মানুষের সাথে কখনোই যৌনকর্মে লিপ্ত হইনি। যদিও আমি অনুভব করি, আমার আসলে একজন মেয়ে হওয়া উচিত। কিন্তু আমার নারীত্বকে আমি প্রকাশ করতে পারি না। কেননা আমার শরীর একজন পুরুষের শরীর।
এজন্য আমার মনে হয়, লিঙ্গ-পরিবর্তনের অপারেশন আমার অবস্থার প্রতিবিধানে সহায়ক হবে। কিন্তু ইসলামে এই কাজ বৈধ নাহলে আমি কখনোই তা করব না।
.
তাই আমি আপনাদের জিজ্ঞেস করছি, যাতে করে আমার প্রশ্নের উত্তর দেন আপনারা। আমার মনে হয় না, এমন প্রশ্ন আপনাদেরকে ইতঃপূর্বে কেউ করেছে। কিন্তু অনুগ্রহপূর্বক ব্যাপারটা জটিল হলেও আমার প্রশ্নের উত্তর দিন এবং আমাকে দিকনির্দেশনা দিন। আমি পুরুষ বা নারী যা-ই হই না কেন, আমি একজন মুসলিম। আমি আল্লাহর কাছে চাইছি, তিনি যেন চিরকাল আমাকে মুসলিম হিসেবেই হেফাজত করেন। এ আশা নিয়েই আমার এ চিঠি শেষ করছি যে, আমি আপনাদের কাছ থেকে জবাব পাব এবং আল্লাহর কাছে চাইছি, তিনি যেন আপনাদেরকে আপনাদের খেদমতের উত্তম পারিতোষিক দিয়ে দেন। আসসালামু আলাইকুম।❞
.
উত্তর : ❝প্রথমত, মহান আল্লাহ বলেছেন,
لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ ۚ يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذُّكُورَ - أَوْ يُزَوِّجُهُمْ ذُكْرَانًا وَإِنَاثًا ۖ وَيَجْعَلُ مَنْ يَشَاءُ عَقِيمًا ۚ إِنَّهُ عَلِيمٌ قَدِيرٌ.
“আসমানরাজি ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছে তা-ই সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছে কন্যাসন্তান এবং যাকে ইচ্ছে পুত্রসন্তান দান করেন। অথবা দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছা তাকে করে দেন বন্ধ্যা। নিশ্চয় তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।” [আল-কুরআন, ৪২ (সুরা শুরা) : ৪৯-৫০]
.
তাই একজন মুসলিমের কর্তব্য হবে—আল্লাহর সৃষ্টি ও নির্ধারিত ভাগ্যের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা। আপনার অবস্থা যদি এমনই হয়ে থাকে, যেমনটি আপনি উল্লেখ করেছেন যে, আপনার পুরুষ হওয়ার ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত এবং পরিপূর্ণরূপে একজন পুরুষের ভূমিকা পালন করা আপনার পক্ষে সম্ভব এবং কোনো মানুষের সাথে আপনি যৌনকর্মেও লিপ্ত হননি; তাহলে আপনার পুরুষত্বকে হেফাজত করা, আপনার জন্য আল্লাহ যেই বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা চয়ন করেছে তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা এবং আপনাকে যে তিনি পুরুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন সেজন্য তাঁর প্রশংসা করা আপনার জন্য আবশ্যক। কেননা নারীর চেয়ে পুরুষ উত্তম, মর্যাদার দিক থেকে উন্নত এবং ধর্ম ও মানবতার খেদমতে নারীর চেয়েও অধিক সক্ষম। যেমনটি প্রতীয়মান হয়েছে মহান আল্লাহর বাণী থেকে; তিনি বলেছেন,
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنْفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ.
“পুরুষরা নারীদের ওপর কর্তৃত্বপরায়ণ, যেহেতু আল্লাহ তাদের মধ্যে একের ওপর অপরকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং যেহেতু তারা (পুরুষরা) স্বীয় ধনসম্পদ থেকে (নারীদের জন্য) ব্যয় করে থাকে।” [আল-কুরআন, ৪ (সুরা নিসা) : ৩৪]
.
তদ্রুপ ইমরানের স্ত্রী (ইসা আলাইহিস সালামের মাতামহী তথা নানী) যে মানত করেছিলেন, তাঁর গর্ভস্থ সন্তানকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তিনি আল্লাহর দিনের খেদমত এবং আল্লাহর গৃহের পরিচর্যায় নিয়োজিত করবেন, সেই ঘটনা থেকেও এ বিষয়টি প্রতীয়মান হয়। এ ব্যাপারে বর্ণিত আরও দলিলপ্রমাণ থেকে এটাই প্রমাণিত হয়। এতদ্ব্যতীত যেসব দেশে ফিতরাত (মানবীয় প্রকৃতি) নষ্ট হয়ে যায়নি, সেসব দেশের বাস্তব জীবনব্যবস্থার মধ্যেও এ বিষয়ের কার্যকরী সৃষ্টিগত দলিল রয়েছে যে, আল্লাহর কিতাব ও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতে বিবৃত—‘পুরুষরা নারীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ’ – কথাটি সঠিক।
.
দ্বিতীয়ত, যেহেতু আপনার পুরুষত্ব সাব্যস্ত ও নিশ্চিত হয়ে গেছে, সেহেতু অপারেশন করে—আপনার ধারণা অনুযায়ী—আপনি যদি নারীতে রূপান্তরিত হন, তাহলে আপনি আল্লাহর সৃষ্টিকে পরিবর্তন করেছেন এবং আপনার জন্য আল্লাহ যা পছন্দ করেছেন সেটার প্রতি আপনি অসন্তুষ্ট হয়েছেন বলেই বিবেচিত হবে। উক্ত অপারেশন সফল হতে পারে এবং আপনি পুরুষ থেকে নারীতে রূপান্তরিত হতে পারেন, সেটা ধরে নিয়েই আমরা এ কথা বললাম। অন্যথায় এই অপারেশন সাকসেসফুল হওয়া সুদূরপরাহত বিষয়। কেননা নারী-পুরুষ উভয়েরই এমন প্রকৃতিগত ও সৃষ্টিগত দৈহিক গঠনতন্ত্র রয়েছে, যেগুলো সৃষ্টি করতে পারেন এবং নির্দিষ্ট উপায়ে তৈরি করতে পারেন কেবল মহান আল্লাহ।
.
এগুলো স্রেফ পুরুষের পুরুষাঙ্গ আর নারীর যোনিমুখের ব্যাপার নয়। বরং অণ্ডকোষ প্রভৃতির দ্বারা গঠিত, পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত, একটি সুবিন্যস্ত পূর্ণাঙ্গ দৈহিক গঠন রয়েছে পুরুষের। আবার দৈহিক গঠনের প্রতিটি অংশের নির্দিষ্ট কাজ ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে; যেমন অনুভূতি, নির্দিষ্ট উপায়ে (কিছু) নির্গতকরণ প্রভৃতির মতো কাজ ও বৈশিষ্ট্য। অনুরূপভাবে নারীর গর্ভাশয় ও তার সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন অর্গান রয়েছে, যেগুলো একটি অপরটির সাথে সম্পর্কযুক্ত; আর প্রতিটি অর্গানের রয়েছে অনুভূতি, নির্দিষ্ট উপায়ে (কিছু) নির্গতকরণ প্রভৃতির মতো বৈশিষ্ট্য। আর সবগুলোর মাঝে রয়েছে পারস্পরিক সম্পর্ক। এগুলো সৃষ্টি করা, পরিচালনা করা এবং এগুলোর যথাযথ পরিচর্যা করা কোনো সৃষ্টির কাজ নয়। বরং এগুলো আল্লাহর কাজ; যিনি মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়, সমুন্নত, পরাক্রমশালী, সূক্ষ্মদর্শী, সবিশেষ অবগত।
.
সুতরাং আপনি যেই অপারেশন করতে চাইছেন, তা এক ধরনের অনর্থক কাজ এবং এমনকিছুর প্রচেষ্টা—যার নেপথ্যে কোনো ফায়দা নেই। বরং আপনার প্রাণনাশের মতো কিছু যদি নাও ঘটে, তবুও এতে ক্ষতির আশঙ্কা আছে। আপনার উদ্দেশ্য অর্জিত হওয়ার বদলে কমসেকম এতটুকু ক্ষতি তো হবেই যে, আল্লাহ আপনাকে যা দিয়েছেন সেটাও চলে যাবে আপনার কাছ থেকে। অধিকন্তু এই ব্যর্থ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আপনি যেই মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে চাইছেন, সেটাও আপনার সাথে থেকে যাবে সবসময়ের জন্য।
.
তৃতীয়ত, আপনি পুরুষ কিনা তা যদি নিশ্চিত না হন, কেবল আপনার শরীরের বাহ্যিক পুরুষালি বৈশিষ্ট্য দেখে আপনি নিজেকে ধারণা করছেন পুরুষ বলে, আবার মনস্তাত্ত্বিকভাবে আপনার মাঝে নারীর বৈশিষ্ট্য রয়েছে বলে মনে করছেন, অনুভূতি ও যৌনাবেদনের দিক থেকে পুরুষদের প্রতি আকর্ষণবোধ করছেন; ব্যাপার যদি এমনই হয়, তাহলে ধীরস্থিরভাবে আপনার ব্যাপারটা যাচাই করুন। আপনি যেই অস্ত্রোপচারের কথা বলেছেন, সেটা করতে যাবেন না। আপনি এ বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছে নিজেকে সমর্পণ করুন; যেমন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগণের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে পারেন। তারা যদি নিশ্চিত হয়, আপনি বাহ্যিক দিক থেকে পুরুষ হলেও বাস্তবে (জৈবিকভাবেই) আপনি একজন নারী, তাহলে আপনি নিজেকে তাদের কাছে অর্পণ করুন, যেন তারা অপারেশন করে আপনার প্রকৃত নারীত্ব বের করে আনে। এটা পুরুষ থেকে নারীতে রূপান্তরকরণ হিসেবে বিবেচিত হবে না (কারণ এর মাধ্যমে জন্মগত দৈহিক ত্রুটিকে ঠিক করা হয়, এর সাথে মনের সম্পর্ক নেই – অনুবাদক)।
.
কেননা পুরুষ থেকে নারীতে রূপান্তর করার কাজ তাদের নয়। এটা তো আপনার প্রকৃত বাস্তবতাকে প্রকাশ করা এবং আপনার শরীরে ও নিজের অভ্যন্তরে থাকা অস্পষ্টতাকে দূর করার নামান্তর। যদি অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের কাছে আপনার এমনকিছু প্রতিভাত না হয়, তাহলে অপারেশন করতে যাবেন না। আপনি আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন, আপনার রবকে সন্তুষ্ট করার জন্য আপনি যেই মুসিবতে পড়েছেন তাতে ধৈর্যধারণ করুন। নিজের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে না জেনে এবং হেদায়েতের পথে না চলে যেসব কাজ সম্পাদন করা হয়, সেসবের ক্ষতিকর পরিণতি থেকে বেঁচে থাকার মাধ্যমেই সম্পন্ন হবে আপনার ধৈর্যধারণ। আপনি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে যান এবং তাঁর কাছেই কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করুন, যেন আপনার মুসিবত তিনি দূর করে দেন এবং আপনার মানসিক যন্ত্রণা থেকে আপনাকে মুক্তি দেন। কেননা সকল কিছুর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব মহান আল্লাহর হাতেই রয়েছে, তিনি সর্ববিষয়ে মহাশক্তিমান।
.
আর আল্লাহই তৌফিকদাতা। আমাদের নবি মুহাম্মাদ, তাঁর অনুসারীবর্গ ও সাহাবিবৃন্দের জন্য আল্লাহ ধার্য করুন সালাত ও সালাম।❞
.
ফতোয়া প্রদান করেছেন—
ইমাম আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ বিন বাজ রাহিমাহুল্লাহ (চেয়ারম্যান)
ইমাম আব্দুর রাজ্জাক আফিফি রাহিমাহুল্লাহ (ডেপুটি চেয়ারম্যান)
ইমাম আব্দুল্লাহ বিন গুদাইয়্যান রাহিমাহুল্লাহ (মেম্বার)
আল্লামা আব্দুল্লাহ বিন কাউদ রাহিমাহুল্লাহ (মেম্বার)
·
উৎস : ফাতাওয়াল লাজনাতিদ দায়িমা, সংকলন ও বিন্যাস : আহমাদ বিন আব্দুর রাজ্জাক আদ-দুয়াইশ (রিয়াদ : রিয়াসাতু ইদারাতিল বুহুসিল ইলমিয়্যাতি ওয়াল ইফতা, তাবি), গুচ্ছ : ১, খ. ২৫, পৃ. ৪৫-৪৯, ফতোয়া নং : ২৬৮৮।
.
[[ ফতোয়াটি অনুবাদ করেছেন মুহতারাম Md Abdullah Mridha ]]
