আমার একটা পাপের গল্প আছে।
শুনেছি , পাপের গল্প বলতে নেই। তাতে নাকি পাপের পরিমান আর স্বাক্ষী বেড়ে যায়। কিন্তু আমার এই পাপের গল্পটা খুব বলতে ইচ্ছে করে। নিজের পাপ লুকিয়ে রাখতে মন চাইলেও মাঝে মধ্যে মানুষ জনকে জড়ো করে, চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে , আমার মত এমন অন্যায়-অপরাধ আর কেউ করবেন না।
২০০৯ সালে জুলাই মাসের ভ্যাপসা গরমের রাত। অন্ধকার আর অসহ্য গরম। ঘটনাটি সেই রাতের।
দেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়া আসার আগে আমি আর আমার বউ চিন্তা করলাম, নতুন দেশে যাচ্ছি কি কাজ করবো , কোথায় থাকবো কিছুইতো নিশ্চিত নয়, তাই হাতে কিছু টাকা -পয়সা নিয়ে যাওয়া উচিত। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম কুমিল্লার লাকসাম থানায় একটা ক্লিনিকে একসাথে দুজন কাজ করবো। খবর পেলাম তাদের জরুরি দুইজন ডাক্তার লাগবে, ভালো বেতন দিবে সেই সাথে থাকাও ফ্রি , বাসা ভাড়া লাগবে না। তারাও চাচ্ছে হাসব্যান্ড -ওয়াইফ দুই জন ডাক্তার।
কিছুদিনের মধ্যেই কুমিল্লা শহরের বাসা ছেড়ে দিয়ে আমরা ঐ ক্লিনিকে চলে গেলাম। বেশ পরিষ্কার পরিছন্ন নতুন একটা ক্লিনিক । আমাদের প্রথম দেখেই পছন্দ হয়ে গেলো। আমাদেরকে থাকতে দেয়া হলো ক্লিনিকের তিন তলায় একটা এপার্টমেন্টে। আমাদের মত আরো একটা ডাক্তার দম্পতিকে পেয়ে গেলাম। সোহাগ -তানিয়া। দুইজনকেই আমাদের বেশ পছন্দ হয়ে গেলো। দুই একদিনের মধ্যেই আমরা সবাইকে আপন করে নিলাম। সবার সাথেই আমাদের একটা ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠলো।
![]() |
| © Collected |
দিনের বেলা আমার বউ আউটডোরে রোগী দেখতো আমি আর আরেকজন ডাক্তার রোস্টার অনুসারে একদিন মর্নিং -নাইট আর অন্যদিন ইভিনিং এই ভাবে সপ্তায় সাত দিন ডিউটি করতাম।
খুব ব্যস্ত ক্লিনিক। সারাদিন রাত ইমার্জেন্সিতে রোগী আসতো। সবসময় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশটা রোগী ক্লিনিকে ভর্তি থাকতো।
আমরা কাজ শুরু করলাম জানুয়ারি মাসে আর মার্চ-এপ্রিল মাসের দিকে একটা নতুন ছেলে রিসেপশনিস্ট হিসাবে জয়েন করলো।
নাম মহসিন। ভদ্র -শান্ত হালকা গড়নের একটা ছেলে। সব সময় নাইট ডিউটি করতো। রাতের বেলা যখন ক্লিনিকে নাইট ফলো আপের জন্য বের হতাম। ওয়ার্ড বয়দের সাথে মহসিন নিজেও থাকতো। আমাকে বলতো, "স্যার , কিছু মনে করবেন না। আপনি ওয়ার্ড বয়দের যেসব কাজের নির্দেশ দেন সেগুলি আমিও একটু শুনে রাখি এবং আপনার রাউন্ড শেষে আবার দেখি রোগীর কাজগুলি তারা করেছে কিনা। "
বেশ সচেতন ও কর্মঠ একটা ছেলে।
আমরা থাকতাম তিনতলার একটা এপার্টমেন্টে। রাতের বেলা ইমার্জেন্সিতে রোগী আসলে ইন্টারকমে ফোন দিয়ে আমাকে জানাতো। প্রতি রাতেই দুই -এক ঘন্টা পর পর রোগী আসতো। ঘুমানোর খুব একটা সুযোগ ছিলো না। এত ব্যস্ত একটা ক্লিনিকে মহসিন সব সময় নাইট ডিউটি করতো।
একদিন রাতে রোগী ম্যানেজ করে মহসিনের সাথে একটু গল্প করলাম।
জিজ্ঞেস করলাম ,
-মহসিন, সব সময় নাইট ডিউটি করো কেন ? রাতের পর রাত এইভাবে না ঘুমালে তো শরীর খারাপ করবে।
- কি করবো স্যার ! উপায় নাই। আব্বা -আম্মা ধরছে আমাকে বিয়ে করতে হবে। একজায়গায় বিয়ে ঠিক করেছেন। এইকারণে বাড়িতে একটা নতুন ঘর তুলতেছি। দিনে মিস্ত্রিদের সাথে কাজ করি। একটু টাকা সেভ হয়। "
মহসিনের উত্তর।
কিছুদিন পর শুনলাম , মহসিনের ঘরের কাজ প্রায় শেষ। বিয়ের দিন তারিখ কন্ফার্ম হয়েছে। ক্লিনিকের ডাক্তার -নার্স এবং সব স্টাফ টাকা তুলে একটা ভালো ও দামি কিছু বিয়েতে গিফট করা হবে বলে সিন্ধান্ত হলো।
সেদিন ছিল জুলাই মাসের কোন এক রাত। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে ঘুমিয়েছি কিন্তু মাঝ রাতে মেয়ের কান্না শুনে ঘুম ভেঙে গেলো।
কারেন্ট নেই। ফ্যান বন্ধ। প্রচন্ড গরম ও ভ্যাপসা একটা রাত। ছোট একটা মেয়ে গরমে অস্থিরতা করছে , ঘুমাতে পারছেনা। ক্লিনিকে প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় আই পি এসের সংযোগ ছিল। কারেন্ট চলে গেলে অটোমেটিক সব অন হয়ে যেতো কিন্তু তিনতলায় অটোমেটিক কানেকশন ছিল না। রিসেপশন থেকে কেউ একজন উঠে এসে সিঁড়ির নিচে মিটার বক্সে এসে হাতে সুইচ অন করতে হয়।
আমি বেড রুম থেকে রিসেপশনের ইন্টারকমে ফোন দিলাম। মহসিন ঘুম থেকে উঠে ফোন রিসিভ করলো।
বললাম ,
-মহসিন, কারেন্ট চলে গেছে। তিন তলার জেনারেটরের সুইচটা দাও।
- জ্বি স্যার , দিতেছি স্যার।
মহসিনের ঘুম ঘুম উত্তর।
বেশ কিছুক্ষন হয়ে গেলো , ফ্যান তখনও বন্ধ। কারেন্ট আসেনি।
মেয়েকে হাত পাখা দিয়ে বাতাস করে শান্ত করার চেষ্টা করছি। কিন্তু আরামে ঘুমাচ্ছে না। অস্থিরতা করছে।
একটু পর আবার রিসেপশনে ফোন দিলাম।
মহসিন ঘুম থেকে উঠে ফোন ধরলো।
আবারো একই কথা বললাম , "জেনারেটরের সুইচটা অন করো।"
কিন্তু মহসিন বোধ হয় ঘুমের ঘোরে ভুলে গিয়েছিলো।
তৃতীয় বার ফোন দিয়ে মহসিনকে দিলাম এক বকা। রাগ উঠে গিয়েছিলো।
কি বলেছি , ভালো করে মনে নেই কিন্তু রাগ করে বকা দিয়েছি এই কথা মনে আছে।
"সরি স্যার ! এখনই দিতেছি স্যার !"
এইসব বলতে বলতে মহসিন ফোন রেখে দিলো।
কিছুক্ষন পরই ফ্যান চলতে শুরু করলো। মেয়েও শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লো , আমিও মেয়ের সাথেই একসময় ঘুমিয়ে গেলাম।
ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে যখন ব্রাশ করার জন্য বেসিনের পাশে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম,
নিজেকে দেখলাম, তখনিই রাতের ঘটনা মনে পড়লো।
মনে মনে একটু আফসোস করতে শুরু করলাম। শুধু শুধু মহসিনকে এমনভাবে ঘুম থেকে তুলে বকা না দিলেই পারতাম। ছেলেটা সারাদিন পরিশ্রম করে আবার নাইট ডিউটিতে আসে, ভালো করে ঘুমাতে পারেনা। আমি নিজেই একটু সিঁড়ি বেয়ে নেমে সুইচটা অন করে দিলেই পারতাম। কি এমন হতো !
এইসব ভাবতে ভাবতে ব্রাশ শেষ করলাম।
সকালের নাস্তা শেষে মর্নিং ডিউটি শুরু করার জন্য নীচে নেমে আসলাম। রিসেপশনে তখন অন্য স্টাফ। বুঝলাম মহসিন নাইট ডিউটি শেষ করে বাড়ি চলে গিয়েছে।
তখনও রোগীর ভিড় বাড়েনি। একটু আয়েশ করে চা খাচ্ছি আর ভাবছি আজ রাতে আবার যখন মহসিন আসবে তখন মহসিন কে দেখে বলবো ,
"মহসিন ! দোকানে ওয়ার্ড বয় পাঠাও। কড়া করে চা আনো। তোমার জন্যও আনতে বলো। "
তারপর চা খেতে খেতে ওকে বলবো ,
-সরি মহসিন , রাতে মনে হয় তোমাকে বকা দিয়েছি। মেয়েটা গরমে এমন অস্থিরতা করতেছিলো
মহসিন হয়তো বলবে ,
-না স্যার। আমি এমন টায়ার্ড ছিলাম। ঘুম থেকে উঠেই আবার ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম।
কথা ঘুরিয়ে আমি বলবো ,
- তারপর তোমার বিয়ের খবর কি বলো ?
মহসিন হয়তো একটু লজ্জা পেয়ে বলবে ,
- এই তো স্যার , সব প্রায় ঠিকঠাক।
এরপর আমি জিজ্ঞেস করবো , এখন বলো তোমাকে বিয়েতে কি গিফট করবো ?
মহসিন বলবে , "না স্যার, কিছুই দিতে হবে না , আমার জন্য শুধু একটু দোয়া করবেন। "
আমি মনে মনে এইসব কথা ভাবছি আর চা খাচ্ছি।
বেশিক্ষন সময় পাইনি। এরপর প্রায় সারাদিনের জন্য ব্যস্ত হয়ে গেলাম।
শেষ বিকেলে ক্লিনিকের তিন তালার সেই এপার্টমেন্টে ডাইনিং রুমে বসে আছি।
কাজের মেয়ে রান্না ঘরে চা বানাচ্ছে , চায়ের জন্য অপেক্ষা করছি। বউয়ের রান্না-বান্নাও প্রায় সব শেষ। একসাথে বসে দুজনে চা খাবো আর একটু গল্প করবো। মেয়েটা বিছানায় বসে টিভিতে কার্টুন দেখছে। প্রতিদিনের মত আরো একটা দিন।
এমন সময় দরজায় কেউ একজন জোরে নক করলো। দরজা খুলে দেখি একটা ওয়ার্ড বয় হাঁফাতে হাঁফাতে আমাকে বলছে ,
"স্যার একটু তাড়াতড়ি ইমার্জেন্সিতে আসেন, মহসিন ভাই ইমার্জেন্সিতে। "
আমি বুঝতে পারলাম ছেলেটা দৌড়ে এসেছে , তারমানে নিশ্চয়ই খারাপ কোনো রোগী।
মহসিনের নাম শুনে আবার সব কিছু মনে পরে গেলো। সকালে মনে মনে যা কিছু বলেছি কথা গুলি আবার এক মুহূর্তের জন্য মনে চলে আসলো।
আমি সাথেই সাথেই ইমার্জেন্সিতে যাওয়ার জন্য বের হয়ে গেলাম।
সিঁড়িতে ওয়ার্ড বয়টাকে জিজ্ঞেস করলাম ,
"মহসিন আজকে এতো আগে চলে আসলো কি ব্যাপার ?
মহসিনের ডিউটিতো রাত আটটা থেকে শুরু। "
আমার প্রশ্ন শুনে ওয়ার্ড বয়টা বললো , "না স্যার, মহসিন ভাই নিজেই রোগী। ওনাকে অজ্ঞান অবস্থায় বাড়ির লোকজন নিয়ে এসেছে। "
ইমার্জেন্সিতে গিয়ে দেখি আমার অন্য কলিগ ডাঃ সোহাগ মহসিনকে সি পি আর দিতেছে।
আমাকে দেখেই বললো ,
"শাহীন ভাই, একটু এড্রেনালিন ইনজেকশন দেন। "
আমিও তাই করলাম। দুজন মিলে বেশ কিছুক্ষন সি পি আর দিলাম।
যারা নিয়ে এসেছিলো তাদের কাছে শুনলাম , মহসিনের নতুন ঘরে ইলেকট্রিক লাইন দিতে গিয়ে তার ইলেকট্রিক শক হয়।
না , আমরা আসলে কিছুই করতে পারিনি।
মহসিন মরে গেলো।
তার হয়তো স্পট ডেথ ছিলো। বাড়ির মানুষজন অজ্ঞান ভেবে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলো।
আমি মহসিনের হাতটা ধরে একটু সময় দাঁড়িয়ে ছিলাম।
একটা কথাই শুধু মনে এসেছিলো ,
"মহসিন যেওনা ভাই , তোমার সাথে আমার কথা আছে। "
তারপর সেই ক্লিনিকে আরো তিন-চার মাস ছিলাম। অনেক রাত জেগে রোগী দেখেছি। কত সময় আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছি। কিন্তু আমাকে যে ক্ষমা করবে, সে আর কোন দিন নাইট ডিউটিতে ফিরে আসেনি।
এই ঘটনার পর থেকে যদি কখনো দেখতাম কেউ একজন রাস্তার রিকশা ড্রাইভারের সাথে রাগারাগি করে , গায়ে হাত তুলে রিকশাওয়ালাকে গালে চড় দিয়ে চলে যাচ্ছে , আমার ইচ্ছে করতো দৌড়ে গিয়ে লোকটার হাত ধরে বলি ,
"চলে যাবেন না ভাই , হিসাব নিকাশ আজ এখানেই চুকিয়ে ফেলুন ।
দয়া করে শুনুন, আমার একটা পাপের গল্প আছে ।
লিখেছেনঃ ডা.শামছুল আলম
